যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা এখনো বেশ শক্তিশালী। স্বর্ণের দামের ওঠানামা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে আপৎকালীন বিনিয়োগ হিসেবে এর জনপ্রিয়তা বজায় রয়েছে। বিশেষ করে উদীয়মান বাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। খবর রয়টার্স।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে নিউইয়র্কের ফিউচার মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১০০ ডলারে নেমেছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার ঠিক আগের সময়ের তুলনায় এটি ছিল একটি বড় পতন। যদিও পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা সংশোধন হয়ে বর্তমানে ৪ হাজার ৮০০ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। তবে এটি চলতি বছরের জানুয়ারির রেকর্ড দর ৫ হাজার ৫৮৬ ডলারের তুলনায় অনেকটাই কম। সাধারণত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো সংকট তৈরি হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে, কিন্তু এবার জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়, যার ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে যায়। সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে ডলারে বিনিয়োগ করাকেই বেশি লাভজনক মনে করেন।
এ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এশিয়ার বাজারে স্বর্ণের ইতিবাচক প্রবাহ বজায় ছিল। জাপানের মার্কেট স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, মার্চে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ বিক্রি করে দিলেও এশিয়ার ক্রেতারা স্বর্ণ কেনা অব্যাহত রেখেছেন। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোয় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা সামগ্রিক বাজারকে স্থিতিশীল রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা কিছুটা কমে আসায় বিনিয়োগকারীরা আবারো নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ফিরতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে নিজেদের স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে ব্যস্ত। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণে সঞ্চয় শুরু করেছে। চলতি বছরের মার্চেই পিপলস ব্যাংক অব চায়না তাদের স্বর্ণের মজুদ আরো পাঁচ টন বাড়িয়েছে। এশিয়ার অন্য দেশ যেমন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও সম্প্রতি নিজেদের জাতীয় মজুদে স্বর্ণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজস্ব মুদ্রার মান ঠিক রাখতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দিলেও স্বর্ণ বিক্রির ব্যাপারে তারা বেশ রক্ষণশীল। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শাউকাই ফ্যানের মতে, স্বর্ণের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর একটি কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক টান থাকে। সাধারণত কোনো দেশ চরম অর্থসংকটে না পড়লে তাদের স্বর্ণ বিক্রি করতে চায় না। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশই আসে সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে। এশিয়ার মানুষের কাছে এটি কেবল একটি বিনিয়োগ নয়, বরং সম্পদ জমানোর একটি নিরাপদ মাধ্যম। সব মিলিয়ে আগামী নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনের আগে স্বর্ণের দাম নতুন করে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।